সমসাময়িক বিষয়ে ইসলামিক প্রশ্নত্তোর পর্ব-০১

 প্রশ্ন : এমন কোনো বস্তু যেটা পানি দ্বারা ধোয়া যাবে না যেমন- মোবাইল, মানিব্যাগ, ল্যাপটপ ইত্যাদিতে নাপাকী লেগে গেলে করণীয় কী?

উত্তর: নাপাকী পবিত্র করার মাধ্যম দুটি- ১. ধৌত করা ও ২. মুছে নেওয়া। যদি এমন স্থানে নাপাকী লাগে, যা পানি দ্বারা ধৌত করলে সেটির কোনো ক্ষতি হবে না, তাহলে তা সম্ভবপর পানি দ্বারা ধৌত করতে হবে। আর যদি পানি দিলে সেটি নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে কোনো কিছু দিয়ে নাপাকী মুছে ফেললেই তা পবিত্র হয়ে যাবে। আব্দুর রহমান ইবনু আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর উম্মু ওয়ালাদ দাসী থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আমি উম্মু সালামা রাযিয়াল্লাহু আনহা-কে বললাম, আমি কাপড়ের আঁচল খুবই ঝুলিয়ে পরি। অনেক সময় ময়লা জায়গা দিয়েও আমার হাঁটতে হয়। এমতাবস্থায় আমার করণীয় কী? তিনি বললেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘পরবর্তী পবিত্র স্থান তাকে পবিত্র করে দিবে’ (তিরমিযী, হা/১৪৩)।


প্রশ্ন: সন্ধ্যার পরে বাহিরে কাপড় থাকলে কোনো ক্ষতি হয় কি?

উত্তর: এগুলো প্রচলিত কুসংস্কারমাত্র। এসব বিশ্বাস করা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট লোকেরা অশুভ সম্পর্কে আলোচনা করছিল। তখন তিনি বললেন, ‘কোনো কিছুর মধ্যে যদি অশুভ থাকে তবে তা হলো বাড়ি, স্ত্রী ও ঘোড়া’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫০৯৪)। অর্থাৎ বাড়ির প্রতিবেশী খারাপ, অবাধ্য স্ত্রী ও অবাধ্য ঘোড়া। এর বাইরে কোনো কিছুতে অশুভ আছে বলে বিশ্বাস করা যাবে না।


প্রশ্ন : জনৈক ব্যক্তি তার মেয়েকে এক ছেলের সাথে জোর করে বিবাহ দিতে চায়। এক্ষেত্রে শরীআতের বিধান কী?

উত্তর : মেয়ে রাজি না থাকলে কারো সাথে জোর করে বিয়ে দেওয়া শরীআত সম্মত নয়। যেহেতু মহানবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘অকুমারীর পরামর্শ বা জবানী অনুমতি না নিয়ে এবং কুমারীর সম্মতি না নিয়ে তাদের বিবাহ দেওয়া যাবে না। আর কুমারীর সম্মতি হলো চুপ থাকা’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫১৩৬; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪১৯)। সুতরাং এমনটি করা সেই ব্যক্তির জন্য জায়েয হবে না। আর যদি জোর করে বিবাহ দিয়েও দেয়, তাহলে বিবাহের পরে সেই বিবাহ বলবৎ রাখা বা না রাখার পূর্ণ ইখতিয়ার থাকবে সেই মেয়ের জন্য (আবূ দাঊদ, হা/২০৯৬)।


প্রশ্ন : সৎ মায়ের প্রতি সৎ ছেলের কি কোনো দায়িত্ব আছে?

উত্তর : হ্যাঁ, সৎমায়ের প্রতি সৎছেলের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। তার সাথে সদাচণ করা, তার খোঁজ-খবর নেওয়া। আর তার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নিতে পারলে তো বড় ইহসান হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি বানী ইসরাঈলের নিকট থেকে পাক্কা ওয়াদা নিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদত করবে না, পিতা-মাতা, নিকটাত্মীয়, ইয়াতীম ও মিসকীনদের সাথে ভালো ব্যবহার করবে’ (আল-বাক্বারা, ২/৮৩)। আপন মা, সৎ মা এরা হলো পিতার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ও পিতা-মাতার বন্ধু-বান্ধবের সাথে ভালো ব্যবহার প্রসঙ্গে একটি হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। আবূ উসাইয়্যিদ আস-সাঈদী রযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমরা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ছিলাম এমন সময় হঠাৎ করে বনূ সালামা গোত্রের জনৈক ব্যক্তি আসলেন। এসে বললেন, আল্লাহর রাসূল! পিতা-মাতা মৃত্যুর পর কোনো ভালো আচরণ বাকি থাকে কি যার দ্বারা আমি তাদের সাথে ভালো আচরণ করতে পারব। তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, আছে! তুমি তাদের মৃত্যুর পর তাদের জন্য ক্ষমা চাইবে, তাদের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করবে, তাদের সূত্র ধরে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখবে, তাদের বন্ধু-বান্ধবদের সম্মান করবে’ (আবূ দাঊদ, হা/৫১৪২; মিশকতা, হা/৪৯৩৬)।


প্রশ্ন : বর্তমানে অনলাইনওঅফলাইন শপ এ কিছু পোশাক পাওয়া যায় যেগুলোতে সংক্ষেপে কুরআনের আয়াত বা হাদীছ লেখা থাকে, দ্বীন প্রচারের জন্য এমন পোশাক পরিধান করা কি বৈধ? বা এভাবে দ্বীন প্রচার করাকে কি ইসলাম সমর্থন করে?

উত্তর: সমাজে প্রচলিত কিছু প্রথা আছে যেমন- আয়াতুল কুরসী, সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস লিখে দেওয়ালে লটকিয়ে রাখলে সেই বাড়ীতে শয়তান প্রবেশ করতে পারবে না বা কোন ক্ষতি করতে পারবে না। এগুলো ভুল ধারনা এবং কুসংস্কার ছাড়া কিছুই নয়, যেগুলো করা মোটেই উচিত নয়। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি এমন আমল করল যে আমলে আমাদের নির্দেশ নেই, সেটি প্রত্যাখ্যাত, (ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৮)।

অনুরুপভাবে পোশাকে কুরআনের আয়াত বা হাদীছ লিখে দ্বীন প্রচারের অংশ বানানো যাবে না। কারণ এতে কুরআনের অবমাননা করা হবে। এভাবে দাওয়াত দেওয়া বা দ্বীন প্রচার করার শারঈ কোন ভিত্তি নেই। আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তার ছাহাবীগণ, তাবেঈন এবং তাবে-তাবেঈনসহ পূর্বসূরী ছালাফে ছালেহীন যেভাবে দাওয়াত দিয়েছেন ও দ্বীন প্রচার করেছেন সেভাবেই দ্বীন প্রচার করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ

তুমি তোমার রবের পথে কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা এবং উত্তম উপদেশ দ্বারা আহবান করো, (আন নাহাল, ১৬/১২৫)।


প্রশ্নঃ আমি বাবার সাথে ব্যবসা করি। তবে হাত খরচের জন্য কখনো কখনো বাবাকে না বলে কিছু টাকা গ্রহণ করি। এটা আমার জন্য বৈধ কি না?

উত্তরঃ যদি পুঁজি বাবার হয়, সবকিছু বাবার হয়, তাহলে বাবার অনুমতি লাগবে। প্রশ্ন শুনে আপনার কিছু পুঁজি বাবার কিছু পুঁজি এরকম মনে হল না। বাবার ব্যবসা, আপনি সেখানে কর্ম করেন, এন মনে হল। এখানে একটি কথা বলে রাখি, আমাদের সমাজে ভাইয়ের দোকানে ভাই কাজ করে, বাবার ব্যবসায় ছেলে কাজ করে কিন্তু কোনো চুক্তি থাকে না। বেতনের কথা থাকে না। এটা ঠিক নয়। এতে ‍যিনি কাজ করেন তার উপর জুলুম হয়। সন্তান হলেও পিতার দায়িত্ব- তুমি আমার এখানে কাজ করবে তোমাকে এই পরিমাণ অর্থ বা হাত খরচ দেয়া হবে, এটা বলা। আমরা সন্তানদেরকে কর্মমুখী করব। পরনির্ভরশীল করব না। আর যদি এই ধরণের কোনো কথা না থাকে তাহলে আপনি বাবাকে না বলে টাকা নিতে পারেন না। বাবাকে বলতে হবে আমি মাঝে মাঝে হাত খরচ নেব।


প্রশ্নঃ কত টাকা হলে যাকাত ফরয় হয়?

উত্তরঃ যদি কারো কাছে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার দাম অথবা সাড়ে সাত ভরি সোনার দাম থাকে, যেটা কম হয়, বর্তমানে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার দাম প্রায় বত্রিশ তেত্রিশ হাজার টাকা (বর্তমাণ মূল্য যা সে অনুযায়ী হবে)। এই পরিমাণ অর্থ যদি কারো কাছে এক বছর থাকে তাহলে যাকাত দিতে হবে। এর যত বেশি হবে পুরো টাকারই যাকাত দিতে হবে।


প্রশ্নঃ প্রাণির ছবিযুক্ত পোশাক পরে নামায হবে কি না?

উত্তরঃ অবশ্যই ক্ষতি হবে। শুধু প্রাণির ছবি নয় যে কোনো পূজ্য বিষয় যেমন পোশাকে বা গায়ে যদি ক্রূশের চিহ্ন থাকে; ক্রূশ কিন্তু কোনো প্রাণির ছবি নয়, কিন্তু একটা নির্দিষ্ট ধর্মের মানুয় ওটাকে পূজার বিষয় মনে করে। এই ধরনের যে কোনো ছবি, প্রাণির ছবি শরীরে বা পোশাকে থাকলে সালাত মাকরুহ হবে। অত্যন্ত গোনাহের কাজ হবে। যেটা হাদীস এবং ফিকহে বারবার বলা হয়েছে।



Comments